সাইকোলজিক্যাল অ্যাবিউস

সাইকোলজিক্যাল অ্যাবিউস এক ধরণের অ্যাবিউস। অ্যাবিউস কি? শাব্দিক অর্থে অ্যাবিউস মানে অপব্যাবহার। মনোবিজ্ঞান এ অ্যাবিউস হল একধরণের ইন্টার‍্যাকশন অথবা মিথস্ক্রিয়া যেখানে একজন মানুষ বা এক পক্ষ আরেকজন মানুষ বা প্রাণী অথবা আরেক পক্ষের সাথে নিষ্ঠুর, হিংসাত্মক, অথবা আক্রমণাত্মকভাবে আচরণ করে। অ্যাবিউস এমন একটি ক্ষতিকর বিষয় যার ফলে এর শিকার ব্যাক্তির বা প্রাণীর বিভিন্ন ধরণের গুরুতর শারীরিক ও মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।

অনেকেই অ্যাবিউস কথাটি শুনলে মনে করে থাকেন যে অ্যাবিউস মনে হয় কাওকে শারীরিকভাবে আঘাত করা অথবা যৌন নির্যাতন করা। এই দুইরকম অ্যাবিউস ছাড়াও আরও কিছু ধরণের অ্যাবিউস রয়েছে। সাইকোলজিক্যাল অ্যাবিউস এর মধ্যে অন্যতম এবং খুবই ক্ষতিকর পরিণতি তৈরি করতে সক্ষম।

সাইকোলজিক্যাল অ্যাবিউস কি? এই অ্যাবিউস হল প্রতিনিয়ত এবং ইচ্ছাকৃতভাবে কথার মাধ্যমে এবং অন্যান্য সব অশারীরিক উপায়ে (অর্থাৎ শারীরিকভাবে আঘাত না করে) অন্য কাওকে মানসিকভাবে আঘাত দেওয়া বা কষ্ট দেওয়া, হীন করার চেষ্টা করা, নিজের প্রয়োজন হাসিল করা, দুর্বল করার চেষ্টা বা ভয় দেখানো। এবং ফলে একজন মানুষের নিজের সম্পর্কে নিজের ধারণা নিয়ে সংকোচ হওয়া শুরু হয়, নিজের স্মৃতিশক্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা শুরু করে এবং এক পর্যায়ে মানুষটির সার্বিক কল্যাণ ব্যহত হতে থাকে। এই ধরণের অ্যাবিউস অনেকেই বুঝতে পারেন না এবং এর ক্ষতি গুলো সম্পর্কেও ধারণা অনেকের নেই। বিভিন্ন উপায়ে একজন বা একদল মানুষ অন্য কাওকে সাইকোলজিক্যালী অ্যাবিউস করে থাকে। উদাহরণস্বরূপ –

- গালাগালি করা;

- সবসময় সমালোচনা করা বা ছোট করে কথা বলা;

- ভুক্তভোগীকে উদ্দেশ্য করে চিৎকার করা;

- উপহাস করা;

- ভয় দেখানো বা হুমকি দেওয়া;

- মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা;

- শিশুর সামাজিক, মানসিক অ বুদ্ধিগত বিকাশ হতে বাঁধা দেওয়া বা প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি না করা;

- হয়রানি করা অথবা প্রতিনিয়ত একটি মানুষ কে অনুসরণ করার মাধ্যমে তার গোপনীয়তা ব্যহত করা;

- অপমান করা বা কুৎসা রটানো;

- সর্বত নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা ইত্যাদি।

বিভিন্ন কারণে মানুষ সাইকোলজিক্যাল অ্যাবিউস করে থাকে। যে বা যারা সাইকোলজিক্যাল অ্যাবিউস করে তাঁরা অনেকেই না জেনে করে অথবা এগুলো করে সে ভালো অনুভুতি পায় তাই করে। আবার বিভিন্ন মানসিক অসুস্থতা যেমন পার্সোনালিটি ডিসর্ডার এ আক্রান্ত ব্যাক্তিরাও অন্যদের কে সাইকোলজিক্যালি অ্যাবিউস করে থাকে। সব ধরণের সম্পর্কেই এই ধরণের অ্যাবিউস সংঘটিত হতে পারে যেমনঃ মা-বাবা ও সন্তান এর সম্পর্ক, দাম্পত্য সম্পর্ক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মাঝে, অফিসে প্রোফেশনাল পরিপ্রেক্ষতে, এমন কি রাজনৈতিক বা অন্যান্য নেতৃবৃন্দও সাইকোলজিক্যাল অ্যাবিউস করে থাকে।

যেকোনো ধরণের অ্যাবিউস মুলত দুই পক্ষের মধ্যে যে পক্ষ ক্ষমতার অধিকারী হন বা পাওয়ার পজিশন এ থাকে, সেই পক্ষই করে থাকে। যেমনঃ বাবা-মা সন্তান কে অ্যাবিউস করে থাকে, দাম্পত্য বা প্রেমের সম্পর্কের মধ্যে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে পুরুষ পার্টনারটিই অ্যাবিউস করে থাকে, শিক্ষকরাও অনেকসময় শিক্ষার্থীদের অ্যাবিউস করে থাকে ইত্যাদি। এখন মানুষ ক্ষমতা বা পাওয়ার এর অ্যাবিউস কেন করে বা কি মানসিক প্রক্রিয়া কাজ করে এর পিছে, সেটি একটি বিশাল আলোচনা যেটি আমরা পরবর্তীতে আরেকটি লেখায় জানতে পারবো।

বিভিন্ন প্রাণী ও মানুষের উপর করা গবেষণায় উঠে এসেছে যেকোনো ধরণের অ্যাবিউস এর ক্ষতিকর প্রভাব গুলো। সাইকোলজিক্যাল অ্যাবিউস এর মানসিক প্রভাব তো রয়েছেই, দীর্ঘদিন কেও এই অ্যাবিউস এর মধ্য দিয়ে যাওয়ার ফলে, বিশেষ করে শিশুদের এর প্রভাবে শারীরিক সমস্যাও দেখা দেয়। এমনকি দীর্ঘদিন ধরে অ্যাবিউস এর মধ্য দিয়ে যাওয়ার কারণে একটি শিশুর মস্তিষ্কে অন্যান্য শিশুদের তুলনায় গঠনগত ও কার্জগত পার্থক্যও দেখা গিয়েছে। এছাড়াও সাইকোলজিক্যাল অ্যাবিউস এর কারণে একজন ব্যাক্তির সাইকোলজিক্যাল ট্রমাসহ বিভিন্ন ধরণের মানসিক রোগ তৈরি হতে পারে যেমনঃ ডিপ্রেশন, অ্যাংক্সাইটি, পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসর্ডার, সাইকোসিস, ডেমেনশিয়া ইত্যাদি আরও অনেক মানসিক রোগ।

সাইকোলজিক্যাল অ্যাবিউস প্রতিকার ও প্রতিরোধ করতে সর্ব প্রথম প্রয়োজন সচেতনতা। যে ব্যাক্তি বা ব্যাক্তিরা অ্যাবিউস করে এবং যে বা যারা এর শিকার – দুই পক্ষকেই সচেতন হয়ে খেয়াল করতে হবে যে, কোন ধরণের সাইকোলজিক্যাল অ্যাবিউস হচ্ছে কিনা। আমরা নিজ থেকে একটু সজাগ হওয়ার মাধ্যমে এধরনের অ্যাবিউস হওয়া বন্ধ করতে পারি অথবা প্রফেশনাল সাহায্য নিতে পারি।


মারজিয়া আল-হাকীম

ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট

টেলিসাইকিয়াট্রি রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন নেটওয়ার্ক লিমিটেড।